
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শ্রম আইনকে ভিত্তি ধরে এই রুলস বা বিধিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই বিধিমালা হলে বেসরকারি খাতের চাকরিতে ন্যূনতম বেতন ও স্থায়ী নিয়োগপত্র প্রাপ্তি, ছুটির অধিকার, অযৌক্তিক চাকরিচ্যুতি ও হয়রানি বন্ধ, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ বৈষম্য দূর হওয়া ছাড়াও নিয়োগের শর্তানুযায়ী প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আইনি ভিত্তি তৈরি হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রস্তাবিত সার্ভিস রুলে ন্যূনতম বেতন, নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি, বিভিন্ন ভাতা দেওয়া, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, ছুটি, পদোন্নতি, আচরণবিধি, দুর্নীতির তদন্ত, শৃঙ্খলা, আইনি সুরক্ষা, বিরোধ নিষ্পত্তি, শিশুশ্রম, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ আদায়, মাতৃত্বকালীন ছুটি, স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, প্রতিবন্ধীদের চাকরি, চাকরি স্থায়ীকরণ, চাকরি থেকে অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তৈরি পোশাক, পাটকল, ট্যানারিসহ বর্তমানে ৪৭টি খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে দেয় সরকার। এসব খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক খাত হিসেবে ধরা হয়। এর বাইরে আরও ১২টি খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক খাত হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এসব খাতের বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে কোনো উদ্যোগ নেই। এসবের বাইরে অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী কার্যক্রম চালাচ্ছে। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কর্মীদের চাকরিচ্যুতি, ঠিকমতো বেতন-ভাতা না দেওয়া, চাকরির শর্ত ভঙ্গসহ নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় সমাধানে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সরকার নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, বেসরকারি চাকরিজীবীরা যাতে প্রাপ্য ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়ন করা হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৬ কোটি ৯০ লাখ ৯০ হাজার মানুষ কাজে নিয়োজিত আছেন। তাঁদের মধ্যে ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেসরকারি খাতে, ৪ দশমিক ৭ শতাংশ সরকারি খাতে এবং বাকিরা খানাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
বেসরকারি সার্ভিস রুলস প্রণয়নের লক্ষ্যে ১০ মে সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকের সভাপতিত্বে আন্তমন্ত্রণালয় সভা হয়। ওই সভায় সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধি ছাড়াও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ওই সভার সূত্র জানায়, সভায় বেসরকারি সার্ভিস রুলস প্রণয়নে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে একটি কোর কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটি ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছ থেকে লিখিত মতামত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। এ ছাড়া নতুন এই বিধিমালা হলে শ্রম আইনে কোনো সংশোধন বা সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়োজন হবে কি না, সে বিষয়টি শ্রম মন্ত্রণালয়কে যাচাই করতে বলা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মোস্তফা জামান গতকাল বুধবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বেসরকারি চাকরিজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের চাকরির নিরাপত্তাকে সরকার সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ, প্রায়ই শোনা যায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের সুবিধা অনুযায়ী কর্মী ছাঁটাই করছে। নারী কর্মীরা ঠিকমতো মাতৃত্বকালীন ছুটি পান না। অনেক প্রতিষ্ঠান সার্ভিস বেনিফিট দেয় না। বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের এই সমস্যাগুলো দূর করতে বিধিমালা করা হচ্ছে।
সভায় উপস্থিত একজন কর্মকর্তা বলেন, সভায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এ কে এম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী বলেছেন, বিদ্যমান শ্রম আইন বেসরকারি সব খাতে প্রয়োগ করা যায় না। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান আইন মোতাবেক চাকরির শর্তাবলি, নিয়োগ, পদোন্নতি, বেতনকাঠামোসহ অন্যান্য বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকায় কর্মচারীদের প্রাপ্য ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা আদায় করা কঠিন।
সভায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, চীন, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের শ্রম আইনের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশের শ্রম আইনে অসংগতি বা সীমাবদ্ধতা থাকলে তা চিহ্নিত করে একটি যুগোপযোগী ও গ্রহণযোগ্য বেসরকারি সার্ভিস রুলস প্রণয়নের পরামর্শ দেন।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, শ্রম আইনসহ অন্যান্য আইনে বেসরকারি চাকরিজীবীদের সুরক্ষার বিষয়ে বলা থাকলেও তাঁরা ন্যায্য সুবিধা পাচ্ছেন না। বেসরকারি চাকরিজীবীরা সাধারণ যেসব সমস্যায় পড়েন, বিধিমালায় সেসব বিষয়ে বিস্তারিত বলা থাকবে। সব বেসরকারি খাতের কর্মীদের বিষয়গুলো মাথায় রেখে এই বিধিমালা করা হবে।
শ্রম আইনকে ভিত্তি ধরে বেসরকারি খাতের জন্য বিধিমালা করা হবে বলে জানান শ্রম মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ কুদ্দুছ আলী সরকার। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, বেসরকারি খাতের কর্মীদের চাকরিচ্যুতি ঠেকানো যাচ্ছে না। মালিকেরা চাইলে যেকোনো কর্মীকে চাকরিচ্যুত করছেন। এ জন্য বর্তমান আইন ও বিধিমালার যেসব ক্ষেত্রে চাকরিজীবীর স্বার্থের সুরক্ষার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে নতুন নিয়ম সংযোজন করে বিধিমালা হালনাগাদ করার পক্ষে শ্রম মন্ত্রণালয় মতামত দিয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আইনকানুন, বিধিবিধান থাকলেও বেসরকারি পর্যায়ে এসবের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুছ সামাদ আল আজাদ। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত আছে। এসব খাতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
সমন্বিত সার্ভিস রুলস প্রণয়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ফজলুল হক। তিনি বলেন, বেসরকারি খাত বহুমুখী। একেক খাতের কাঠামো, জনবল একেক রকম। ফলে সবার জন্য একই সার্ভিস রুলস করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। ফলে এই সার্ভিস রুলস করার আগে বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।