
অনলাইন ডেস্ক ।। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরের উল্লেখযোগ্য অর্জন ও অগ্রগতির বিবরণ প্রকাশ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
শনিবার (২৭ জুন) মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই দুই দেশে সরকারি সফরের বিস্তারিত প্রাপ্তি তুলে ধরা হয়।
মালয়েশিয়ায় দ্বিপাক্ষিক সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন গতি এসেছে। এই সফরের মূল অর্জনগুলো নিচে দেয়া হলো:
চুক্তি ও সমঝোতা: দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংস্কৃতিবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ বিষয়ে মন্ত্রী পর্যায়ে দুটি নোট বিনিময় হয়েছে।
স্থগিত বৈঠক পুনরুজ্জীবন: দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক দ্রুত পুনরায় শুরু করার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে।
২০২৭ সালের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি: বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি আলোচনা দ্রুত শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে একটি পারস্পরিক লাভজনক, সমন্বিত ও ভবিষ্যৎমুখী চুক্তি সম্পাদনের অঙ্গীকার করেছে দুই দেশ।
ব্যবসায়িক সহযোগিতা: ‘মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল’ প্রতিষ্ঠার অগ্রগতিকে স্বাগত জানানো হয়েছে। দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ, যোগাযোগ ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
শ্রমবাজার ও কর্মীদের কল্যাণ: নিরাপদ, নিয়মিত ও স্বচ্ছ অভিবাসনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরু, দক্ষ কর্মী প্রেরণ এবং অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণের বিষয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন। বিশেষ করে, আটকে থাকা ৮ হাজার শ্রমিকের কর্মে যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তিনি। এ ছাড়া অভিবাসন ব্যয় হ্রাস এবং মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত ও নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে উভয় পক্ষ ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
নতুন সমঝোতা স্মারক: শ্রম সহযোগিতা বিষয়ক ‘Joint Working Group (JWG)’-এর বৈঠকের মাধ্যমে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক মূল্যায়ন এবং বর্তমান প্রয়োজনের আলোকে নতুন বা হালনাগাদ MoU প্রণয়নের বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট ও আসিয়ান: রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান ও দ্রুত প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মালয়েশিয়া সক্রিয় ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিয়েছে। আসিয়ান কাঠামোর আওতায় বিষয়টি এগিয়ে নেয়া এবং মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে সমস্যা সমাধানের সম্ভাব্য করণীয় নির্ধারণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি। একই সঙ্গে ‘ASEAN Sectoral Dialogue Partner’ হিসেবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতে মালয়েশিয়া তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বিনিয়োগ সম্প্রসারণ: জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ, বৈদ্যুতিক যানবাহন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বন্দর ও লজিস্টিকসসহ বাংলাদেশের অগ্রাধিকার খাতগুলোতে মালয়েশীয় বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণে ইতিবাচক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠক এবং বেইজিংয়ে দ্বিপাক্ষিক সফরে চীনের সঙ্গে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম বিশ্বের উদীয়মান শক্তিগুলোর পুরোধা হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এই ফোরামে অংশ নেন। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মুখসারির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রীকে ফোরামে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদানের আহ্বান জানানো হয়।
WEF-এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও-র সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টিকে ফোরামের বার্ষিক সভায় গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপনের প্রস্তাব করেন এবং সিইও এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দেন।
বেইজিং দ্বিপাক্ষিক সফরের অর্জন সম্পর্কের নতুন ধাপ: বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ‘Comprehensive Strategic Cooperative Partnership’ থেকে ‘China Bangladesh Community with a Shared Future’ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।
কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংলাপ: দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ চালু এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ‘২+২’ ডায়ালগ মেকানিজম চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও একমত হয়েছে দুই দেশ।
অবকাঠামো ও করিডোর: মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত পোষণ করেছে। এ ছাড়া বিআরআই-এর আওতায় বড় ও ছোট জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে সহযোগিতার সম্মতি এসেছে। আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারে কুনমিং থেকে বাংলাদেশের বন্দরগুলোতে মাল্টিমোডাল পরিবহন সংযোগ এবং ‘চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তিস্তা ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: ‘তিস্তা নদী ব্যাপক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’-এ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এই প্রকল্পে চীন সর্বসাধ্য সহায়তা প্রদান করবে এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ত্বরান্বিত করার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। এ ছাড়া সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা প্রতিরোধ, নদী ড্রেজিং ও প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা গভীর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক: দুই দেশের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে ৮টি সমঝোতা স্মারক, ৩টি চুক্তি, ১টি প্রটোকল এবং ১টি জয়েন্ট অ্যাকশন প্ল্যান স্বাক্ষরিত হয়েছে।
দলীয় ও বেসরকারি চুক্তি: রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে চীনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ২টি চুক্তি এবং ১টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জোটে সমর্থন: আন্তর্জাতিক জোট ব্রিকস, এসসিও এবং আরসিইপি-এ বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে চীন সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
Leave a Reply