অনলাইন ডেস্ক // দেশের চলমান জ্বালানি সংকট নিয়ে সংসদে কোন বিধিতে আলোচনা হবে তা নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান, ডেপুটি স্পিকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছে। পরে এ বিষয়ে সংসদের বৈঠকে এক ঘণ্টা আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও বিরোধী দলীয় নেতার আনা এ সংক্রান্ত একটি মুলতবি প্রস্তাব স্পিকার নাকচ করে দিয়েছেন এবং বিকল্প বিধিতে নতুন করে নোটিশ আনার পরামর্শ দিয়েছেন।
সোমবার সংসদের বৈঠকে মাগরিবের নামাজের বিরতির পরে এই বিতর্ক হয়। বিরোধী দলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাবটি নাকচ করে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, দেশব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকট এবং এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কারখানায় সৃষ্ট অচলাবস্থাসহ জনজীবনের বহুমাত্রিক সংকট সম্পর্কে আলোচনা’ বর্তমানে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা চলমান। নোটিশটি বিষয়ে অধিবেশন মুলতবি না করেই আলোচনার সুযোগ রয়েছে। মুলতবি করে আলোচনা সমীচীন নয়। তাছাড়া এই নোটিশের বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিয়েছেন। এরপরও আলোচনার সুযোগ পেতে মুলতবি প্রস্তাবের বাইরে যথাযথ বিধিতে নোটিশ দিলে আলোচনা হতে পারে।
স্পিকারের এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হয়ে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান তাঁর প্রস্তাবের পক্ষে সংসদের বৈঠক মুলতবি করে আলোচনার যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, এটি জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বিষয়ে আরও দুই-একবার নোটিশে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। ৭১ বিধিতে সুযোগ দেওয়া হয়নি। এখনও যদি এভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে জনগণের কথা কি- এখানে সবাই মিলে আলোচনা করতে পারব না? আমরা কি একটু সুযোগ সৃষ্টি করব না? এই সমস্যার সমাধানটা কিভাবে করা যায়? কাউকে দোষারোপ করার জন্য নয়, সমস্যার সমাধান খুঁজতে তারা আলোচনা চান বলে দাবি করেন বিরোধী দলীয় নেতা।
তিনি বলেন, জনগণের এত বড় একটা চলমান সমস্যা এই সংসদে আলোচনা করতে না পারাটা কি আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য হবে না? জ্বালানি মন্ত্রীর ৩০০ বিধিতে বিবৃতির কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মন্ত্রীর দেওয়া বিবৃতিতে বাস্তবের সঙ্গে কোনো মিল খুঁজে পাইনি। সেই বিবৃতি দিয়ে কি হবে? এই বিবৃতিতে কি সমস্যার সমাধান হবে? একদিকে বলা হচ্ছে- তেলের কোনো সংকট নাই। আরেকদিকে বাস্তবে যেটা ঘটছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলেন, এই নিয়ে মানুষের মধ্যে দারুণ অসন্তোষ। নোটিশগুলোর কোনটাই আলোচনায় না আসে, বিবেচনায় না নেওয়া হয় তাহলে সংসদে থাকব কেন?
বিরোধী দলীয় নেতার পরে ফ্লোর নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, প্রস্তাবটি অবশ্যই আলোচনার যোগ্য। এটি জাতীয় জীবনে জরুরি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও বটে। স্পিকার আলোচনা নাকচ করেননি, বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, অধিকাংশ সংসদীয় রীতি ও সংসদীয় ইতিহাসে দেখা যায় মুলতবি প্রস্তাবগুলো বিরোধী দল থেকে আসে সরকারি দলের কর্মকাণ্ডকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করতে। কিন্তু সাম্প্রতিক বিষয়গুলো নিয়ে মুলতবি প্রস্তাবের রেওয়াজ আছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে খুব বেশি হলে দুই-চার বার এই সমস্ত মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বর্তমান সংসদের দুটি বৈঠকে একই অধিবেশনে দুইটা মুলতবি প্রস্তাব আলোচনা হয়েছে, এটা ইতিহাসে অনন্য নজির। এই সংসদের আরও একটি বৈঠকে আরও একটি
মুলতবি প্রস্তাবের সুযোগ দেওয়া হলে রেওয়াজটা একটু অন্যরকম হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, বিষয়টি আলোচনা হোক তবে ৭১বিধিতে নোটিশ দিয়ে তার ভিত্তিতে মন্ত্রী বিবৃতি দিতে পারবেন। তখন সম্পূরক প্রশ্নও করা যাবে। আর ৬৮বিধি অনুসারেও সংক্ষিপ্ত আলোচনার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। সেখানে মন্ত্রীও বিবৃতি দেবেন।
এক পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রীর ৩০০ বিধিতে বক্তব্য দেওয়ার পরে মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করে সংসদের বৈঠক মুলতবি রেখে আলোচনার জন্য এই বিষয়টি গুরুত্ব রাখে কী না? কারণ মন্ত্রীর বক্তব্যে জাতির কাছে পরিষ্কার দেশে জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের কোনো সংকট নেই। সেটা পরিসংখ্যান দিয়ে দেখানো হয়েছে। মন্ত্রী দেখিয়েছেন।
সহনীয় পর্যায়ে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদ নেতার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায়, দেশবাসীর সুবিধার্থে যাতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি না হয়। জনজীবনে কোনো দুর্ভোগ না আসে। তেল পাচার হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জ্বালানির মূল্য কিঞ্চিত বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। এই বিষয়ে কোন সংকট নেই।
এ পর্যায়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন- কোনো সংকট নেই। আসলে সংসদের ভেতরে নেই, সংকটটা সংসদের বাইরে। সংকট আছে বলেই জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে হাইকোর্টের মতো খুবই স্পর্শকাতর জায়গায় দুইদিন ভার্চুয়ালি কোর্ট বসছে। এটা মাত্র একটা উদাহরণ।
তিনি বলেন, সংকটটা এই সরকারের সৃষ্টি নয়। এটা বৈশ্বিক ইস্যু। যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে- এগুলো সবাই বুঝি। এই মুহূর্তে দেশে যতগুলো প্রধান সমস্যা আছে এরমধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা হচ্ছে জ্বালানির সমস্যা। এরসঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক কিছু। গোটা অর্থনীতির চাকা নির্ভর করে জ্বালানির ওপর।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী নেতা নোটিশ দিলে সংসদ নেতার উপস্থিতিতে আলোচনা হবে। তবে, আপনি বিধি ভঙ্গ করবেন না। এক ঘণ্টার জন্য আলোচনার সুযোগ দিতে পারেন।
Leave a Reply