অনলাইন ডেস্ক// মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নিয়ে ভুগছে প্রায় সব দেশ। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় স্পট মার্কেট থেকে তেল ও এলএনজি কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনতে এক মাসেই সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, চলমান যুদ্ধাবস্থায় গ্যাস সংকট কাটাতে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। আর এপ্রিলেই এলএনজি কিনতে ভর্তুকি বাবদ জ্বালানি বিভাগের কাছে চার হাজার ৫০৯ কোটি টাকা চেয়ে চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। জ্বালানি বিভাগ সেই চিঠি অর্থ মন্ত্রণালয়কে পাঠিয়েছে।
পেট্রোবাংলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগামী মাসে এলএনজির চাহিদা আরও বাড়বে। যুদ্ধ কতদিন চলমান থাকবে সেটি বলা যাচ্ছে না। এতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা সম্পূর্ণ সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। সরকার কতটা ভর্তুকি দেবে তার ওপর নির্ভর করছে এলএনজি কেনা। ভর্তুকি না দিলে এলএনজি কেনা যাবে না। তাছাড়া সামনে কৃষিকাজে ব্যবহৃত সারের চাহিদা বাড়বে। এতে দুটি সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। ফলে চাহিদা আরও বাড়বে।
- চলতি মাসে ৯ কার্গো এলএনজি আসার কথা। এর মধ্যে ৮ কার্গোই স্পট মার্কেট থেকে কেনা। দামও বেশি পড়েছে, গড়ে ২১ ডলার। আমরা জ্বালানি বিভাগকে চিঠি দিয়েছি সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে। মে মাসে আরও বেশি এলএনএজি আনতে হবে। যুদ্ধ চলমান থাকলে ভর্তুকি তখন আরও বাড়বে।-পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, আগামী মে মাসের চাহিদা মাথায় রেখে ১১ কার্গো এলএনজি আমদানির প্রাথমিক চিন্তা করা হয়েছে। তবে যুদ্ধ চলমান থাকলে বাড়তি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হবে। তাই সরকারকে ঠিক করতে কী পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে কত কার্গো এলএনজি কেনা হবে।
পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর এপ্রিল মাস পর্যন্ত মোট ৯ কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ ও ১৬ মার্চ দেশে খালাস হয়েছে এক কার্গো। ১৮ ও ১৯ মার্চ এক কার্গো আসার কথা থাকলেও সেটি আসেনি, এপ্রিলে আসতে পারে।
এছাড়া ৫ ও ৬ এপ্রিল এক কার্গো, ৯ ও ১০ এপ্রিল এক কার্গো, ১২ ও ১৩ এপ্রিল এক কার্গো, ১৫ ও ১৬ এপ্রিল এক কার্গো, ২১ ও ২২ এপ্রিল এক কার্গো, ২৪ ও ২৫ এপ্রিল এক কার্গো, ২৭ ও ২৮ এপ্রিল এক কার্গো এবং অতিরিক্ত আরও এক এলএনজি দেশে খালাস হওয়ার কথা রয়েছে। এসব কার্গোর মধ্যে মাত্র এক কার্গো এলএনজি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কেনা। বাকি কার্গোগুলো স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত দামে কিনতে হয়েছে।
- যুদ্ধ চলমান থাকলে সংকট বাড়বেই। আমরা ওই রকম ঐশ্বর্যপূর্ণ দেশ না, আবার আর্থিক সক্ষমতাও আমাদের সীমিত। এসব পরিস্থিতিতে আমরা সংকটে পড়বো—এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন দেখার বিষয় যুদ্ধ কতটা প্রলম্বিত হয় এবং এটার ইফেক্ট কতটা পড়ে।-জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম।
পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, প্রতিটি কার্গোতে ৩২ লাখ এমএমবিটিইউ এলএনজি থাকে। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ কিনতে গড়ে ১০ থেকে ১১ ডলার খরচ হতো সেখানে এখন গড়ে ২১ ডলার খরচ করতে হচ্ছে। কিছু কার্গো ২৮ ডলার ২৮ সেন্ট দরে কিনতে হয়েছে। যা প্রায় তিনগুণের কাছাকাছি।
মূলত যুদ্ধ শুরু হয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি। আর বেশি দামে কেনা শুরু হয়েছে ১৫ মার্চ থেকে যেগুলো এসেছে। এর আগেরগুলো আগেই হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছিল। তাই মার্চের ১-১৫ তারিখ পর্যন্ত অতিরিক্ত দামে কেনার কথা চিন্তা করা লাগেনি। এর পরে সবই অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান বলেন, ‘চলতি মাসে ৯ কার্গো এলএনজি আসার কথা। এর মধ্যে ৮ কার্গোই স্পট মার্কেট থেকে কেনা। দামও বেশি পড়েছে, গড়ে ২১ ডলার। আমরা জ্বালানি বিভাগকে চিঠি দিয়েছি সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে। মে মাসে আরও বেশি এলএনএজি আনতে হবে। যুদ্ধ চলমান থাকলে ভর্তুকি তখন আরও বাড়বে। এখন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে কতটা ভর্তুকি দিয়ে কী পরিমাণ এলএনজি আনবে।’
পেট্রোবাংলার এই পরিচালক বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি খুলে দিলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে। কারণ অনেক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলএনজির উৎপাদনও কমবে। অপরদিকে চাহিদা বাড়বে। এতে দাম বেড়ে যেতে পারে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলেন, ‘যুদ্ধ চলমান থাকলে সংকট বাড়বেই। আমরা ওই রকম ঐশ্বর্যপূর্ণ দেশ না, আবার আর্থিক সক্ষমতাও আমাদের সীমিত। এসব পরিস্থিতিতে আমরা সংকটে পড়বো—এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন দেখার বিষয় যুদ্ধ কতটা প্রলম্বিত হয় এবং এটার ইফেক্ট কতটা পড়ে। শুধু আমরা না, আমাদের মতো যতগুলো তৃতীয় বিশ্বের দেশ আছে সবাই সংকটে পড়বে।’
এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘সরকারের দায়িত্ব জনগণকে সুরক্ষিত রাখা। এরকম পরিস্থিতিতে সরকার কী পরিকল্পনা করে রেখেছে তার ওপর পুরো পরিস্থিতি নির্ভর করবে।’
Leave a Reply