
তানিয়া কামরুন নাহার // রুবিনা (ছদ্মনাম) বিবাহিত হলেও স্বামীর কাছ থেকে যথেষ্ট মনোযোগ পায় না। দুজনের চিন্তাভাবনা ও রুচিতেও প্রচণ্ড অমিল। এসব তাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। কিন্তু সে লক্ষ করে সহকর্মী আরিফ (ছদ্মনাম) তার প্রতিটি ব্যাপারেই বেশ যত্নশীল ও মনোযোগী। রুবিনাকে আরিফ অফিসের বাইরেও অনেকটা সময় দেয়, তাকে আনন্দে রাখতে চেষ্টা করে। আরিফ বিবাহিত ও দুই সন্তানের পিতা জেনেও রুবিনা তার জীবনের অপূর্ণতা, তার জীবনের যত শূন্যতা সব আরিফের মাধ্যমেই পূরণ করে নিতে চায়। রুবিনা ভালো করেই জানে, এগুলো সব আরিফের ক্ষণস্থায়ী আবেগ। সেও আরিফের কাছ থেকে খুব বেশি কিছু চায় না। সামান্য একটু মনোযোগ, কিছুটা সময় পেলেই খুশি। মনকে এভাবে প্রবোধ দিয়ে রাখলেও এক সময় ঠিকই তার প্রত্যাশা বাড়তে থাকে। আরিফকে সে আরও বেশি সময় ধরে কাছে পেতে চায়। সামাজিক নীতি-নৈতিকতা, পারিবারিক দায়িত্ব সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে রুবিনা শুধু নিজের ভালো লাগাটুকুকেই প্রাধান্য দিতে চায়। তারও তো সুখী হওয়ার অধিকার রয়েছে!
আরিফের স্ত্রী কান্তা (ছদ্মনাম) ঠিকই বুঝতে পারে, তার স্বামী অন্য নারীর প্রতি আকৃষ্ট। একদিন সে হাতেনাতে ধরেও ফেলে দুজনের মুঠোফোনের বার্তা। কান্তা এরপর রুবিনার সঙ্গে যোগাযোগ করে বুঝিয়েও বলে, আরিফ অন্য নারীদের সঙ্গেও এমন সম্পর্ক রাখে। তাই এসব থেকে নিজেকে দূরে রাখাই রুবিনার জন্য ভালো হবে। কান্তা শুধু নিজ সন্তানের কথা ভেবে সংসারটা চালিয়ে যাচ্ছে। আরিফকে কড়াভাবে কান্তা সতর্ক করে দেয়, যেন রুবিনার সঙ্গে সে আর যোগাযোগ না রাখে। স্ত্রীর ভয়ে আরিফ একটু রয়ে-সয়ে চলে বটে, কিন্তু মনে মনে ঠিকই সুযোগ খোঁজে। রুবিনার জীবনের না পাওয়াকে সে অনুভব করে পুরোপুরি, ইচ্ছে করে রুবিনার সব ইচ্ছে পূর্ণ করে দিতে। অথচ কান্তার নীরব কান্না, কান্তার মনের শূন্যতা এত কাছে বসেও সে অনুভব করে না। অফিসের কাজের বাহানায় আরিফ রুবিনার সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ বের করে নেয়। ওদিকে ঘরে আরিফের সন্তান অর্চি (ছদ্মনাম) জন্মদিনের কেক সাজিয়ে বসে থাকে, বাবা এলে একসঙ্গে কেক কাটবে। কিন্তু বাবা ফিরতে কেন দেরি করছে? অর্চির প্রশ্নের জবাব কান্তার জানা থাকলেও সে কিছুই বলতে পারে না।
বর্তমান সময়ে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটতে দেখা যায়। সাধারণ মানুষের জীবনই বলেন কিংবা কোনো মিডিয়ার তারকা- প্রায় সবখানেই এমন সম্পর্কের জটিলতা, ত্রিভুজ প্রেম, বলা ভালো পরকীয়ার ঘটনা বেড়েই চলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় পরিবারগুলোতে দাম্পত্য কলহ, পারিবারিক সহিংসতা, বিচ্ছেদ, খুন, আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর ঘটনাগুলোও ঘটে চলেছে। এরপর এসবের প্রভাব গিয়ে পড়ছে পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও। হয়তো কারও নিজের মতো একটুখানি ভালো লাগাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে ঘটে যাচ্ছে এমন কোনো সর্বনাশ, যার জের টানতে হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। ঠিক যেন বাটারফ্লাই ইফেক্ট! অথচ এই কাণ্ডগুলো যারা ঘটাচ্ছেন, দেখা যাবে তিনি কোনো অবুঝ ব্যক্তি নন, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী ব্যক্তি! তাহলে শিক্ষাব্যবস্থায় নিশ্চয়ই কোথাও ত্রুটি রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের শুধু জ্ঞানের জাহাজ বানায়, কিন্তু নিজেকে চিনতে শেখায় না, ফলে আবেগিক বুদ্ধিমত্তাও তৈরি হয় না। আর তাই দেখা যায়, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় মানুষ নিজের ব্যক্তিস্বাধীনতা, নিজের ভালোলাগা, আবেগ ও ইচ্ছেকে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে চারপাশের অন্য কাউকে আর তোয়াক্কা করছে না। নিজের যা ভালো লাগছে শুধু সেটুকুই করে যাচ্ছে স্বার্থপরের মতো। কিন্তু দিনশেষে ওই ভালোলাগাটুকুও মিথ্যা হয়ে যেতে এক মুহূর্তও লাগে না।
নিজের আবেগ, ইচ্ছে ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে মানুষ অবশ্যই গুরুত্ব দেবে, কিন্তু সংগত কারণেই প্রশ্ন চলে আসে, কতখানি গুরুত্ব দেবে? এর জবাবে বলা যায়, যতক্ষণ না অন্যের অধিকার, অন্যের স্বাধীনতাকে তা খর্ব করছে। নিজের ভালোলাগার পাশাপাশি নৈতিকতা নিয়েও ভাবতে হবে, যদি নিজেকে কেউ ‘জধঃরড়হধষ ধহরসধষ’ হিসেবে দাবি করতে চায়। আবেগের বশে একটি অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক টানতে গিয়ে ব্যক্তির নিজের মানসিক, শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি আর্থিক, পারিবারিক এমনকি ক্যারিয়ারেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ঘটতে পারে। আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন যে কোনো মানুষই আবেগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমিত হয়ে থাকেন। তাই যত্রতত্র আবেগ না ঢেলে বরং যে কোনো অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক থেকেই দ্রুত বের হয়ে আসার উপায় খুঁজতে হবে। কোনো একজনের ভালোবাসা না পেলেই জীবন অর্থহীন হয়ে যায় না। অন্তর্চক্ষু খোলা রাখলেই ‘বুকের মধ্যে ভালোবাসা থাকবে জীবনময়।’ আর সে ভালোবাসার জোরেই মানুষ হয়ে উঠবে আরও সৃষ্টিশীল, আরও মানবিক, আরও কর্মমুখর।
Leave a Reply